বাংলায় ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে?

বাংলায় ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে? প্রশ্নটি কেবল গুরুত্বপূর্নই নয় বরং খুবই গুরুত্বপূর্ন।

কেননা আমরা যারা ব্লগিং ক্যারিয়ারে নতুন তাদের মাথায় সারাক্ষনই এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খেতে থাকে। আসলে প্রশ্নটি মোটেও অবাঞ্ছিত নয়। কারন, এত কষ্ট করে শ্রম দিয়ে একটি কাজে নামবো, কিন্তু সেই প্লাটফর্মের ভবিষ্যৎই যদি হুমকির মুখে থাকে তাহলে সব কষ্টই যে বৃথা যাবে এত কোন সন্দেহ নেই।

তাহলে চলুন আজকের আর্টিকেলে কিছু প্রমান সহ আলোচনা করা যাক ব্লগিং-এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে।

এক নজরে আর্টিকেলের বিষয়বস্তু –

ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ কি?

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ খুবই ভালো। এবং কেন ভালো বলছি অবশ্যই তা যুক্তি সহকারে বোঝানোর চেষ্টা করবো।

এখন যদি আমি আপনাকে একটা বিপরীত প্রশ্ন করি, আপনি কবে থেকে জানতে পেরেছেন যে ব্লগিং এর মাধ্যমে ইনকাম করা যায়? স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর আসবে অল্প কিছুদিন।

কেননা বিগত ৫ বছর আগেও ব্লগিং থেকে উপার্জনের বিষয়ে বেশির ভাগ মানুষ জানতোও না। আর যারা জানতো তারা সল্প জ্ঞ্যানেই এই সেক্টর থেকে প্রচুর পরিমানে অর্থ উপার্জন করে নিয়েছে। যে সল্প জ্ঞ্যানে এখন ব্লগিং এ চিড়া ও ভিজবে না।

ইউটিউব এর কথায় চিন্তা করুন। বছর ২/৩ আগেও মাত্র ১০,০০০ ভিউ এর মাইলফলক অতিক্রম করে মানুষ স্লাইডশো ভিডিও দিয়ে হাজার হাজার ডলার ইনকাম করেছে।

কিন্তু এখন এর কথা চিন্তা করুন। এখন একটি চ্যানেল মনিটাইজ করতে গেলেও কম পক্ষে ৪ হাজার ঘন্টা ওয়াচটাইম এবং সাথে ১০০০ সাবস্ক্রাইবার লাগবে। তার উপর আবার গুগলও সাফ জানিয়ে দিয়েছে কোন প্রকার স্লাইড শো ভিডিও আর মনিটাইজ হবে না। তাহলে যে সব ভিডিও থেকে আগে মানুষ হাজার হাজার ডলার খুব সহজেই ইনকাম করেছে তা এখন মনিটাইজ ও হবে না।

ব্লগিং এর ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। আপনি একটি ব্লগ তৈরি করলেন এবং সেখানে কেবল নিয়মিত আর্টিকেল লিখেই ব্লগটি পপুলার বানিয়ে ইনকাম শুরু করে দিলেন, সেই দিন আর নেই। এখন আপনাকে একজন ব্লগার হতে হলে কেবল ভালো আর্টিকেল লিখলেই হবে না। তার সাথে এসইও সম্পর্কে ব্যাপক ধারনা থাকতে হবে। আপনাকে এই বিষয়ে নিয়মিত স্টাডি করতে হবে এবং একটি ব্লগ সাইট র‌্যাংক করানোর জন্য পর্যাপ্ত ধারনা অর্জন করতে হবে।

ইউটিউব এবং ব্লগিং সমাচার

এখন যে কথা গুলো বলবো তা অনেক গুরুত্বের সাথে পড়বেন। আমাদের মধ্যে অনেক মানুষ আছে যারা মাঝে মাঝে খুব মাজার মজার প্রশ্ন করে থাকেন।

যেমন – অনলাইনে ইনকাম শুরু করতে চাই কোন প্লাটফর্ম ভালো হবে ইউটিউব নাকি ব্লগিং?
শুনুন ভাই ব্লগিংকে একটি সন্মানজনক পেশা বলা হয়, কিন্তু ইউটিউবকে নয়। আমি অবশ্যই যারা ইউটিউবিং করেন তাদের ছোট করছি না।

কেননা, ব্লগিং কেবল তারাই করতে পারে যাদের প্রচন্ড ধৈর্য্য, নিয়মিত আর্টিকেল পড়া এবং লেখার মানসিকতা রয়েছে। এখন আপনি বলুন তো আমার এই আর্টিকেলটি যদি মাত্র ১০০০ ওয়ার্ডেরও হয় তাহলে কতজন এই আর্টিকেলটি ধৈর্য্য সহকারে পড়বে?

উত্তরটি হলো ”খুবই কম”। এখন যে বা যারা ১০০০ ওয়ার্ডের একটি আর্টিকেল সম্পূর্ন পড়ার ধৈর্য্য রাখে না তারা কিভাবে ১০০০ ওয়ার্ডের একটি আর্টিকেল লিখবে? আবার সেই মানুষরাই কিন্তু আমাদের দেশের অনেক বস্তা পচা ইউটিউবারদের ভিডিও ঘন্টার পর ঘন্টা দেখছে।

এখন আপনার মনে একটি প্রশ্ন আসতে পারে। মানুষ যদি ১০০০ ওয়ার্ডের একটি আর্টিকেল পড়ার ধৈর্য্য না রাখে তাহলে আপনি কষ্ট করে আর্টিকেল লিখলে তো তা মানুষ পড়বে না।

মূল বিষয়টা হলো ভাই, ব্লগিং করা মানুষদের প্লাটফর্মটাই আলাদা। আপনি যদি কোরা ব্যবহারকারী হোন তাহলে দেখবেন সেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন আর্টিকেল পড়ছে। না আছে সেখানে কোন প্রকার ফানি ভিডিও না আছে কাউকে ছোট করার কোন প্রকার রোস্টিং ভিডিও। তবুও এক একটি পোষ্ট দিনে হাজার হাজার ভিউ হচ্ছে এবং মাসে তা লক্ষ্য পরিমান ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটা আমি শুধু কোরার বাংলা ভার্শনের কথাই বলছি। ইংরেজি প্লাটফর্মে কথা না হয় বাদই দিলাম।

আর দিন দিন বাংলা কোরাতে পাঠক সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সামান্য এক কোরার উদাহরনেই বুঝতে পারবেন বাংলায় ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে।

কিন্তু অপরদিকে ফেসবুকের কথায় বলুন, সেখানে তো একবার ঢুকলে বের হবার কথায় মনে থাকে না। ফেসবুক যেখানে এসেছিলো সোস্যাল মিডিয়া হিসাবে আর এখন হয়ে গেছে একটি ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্ম।

এখন আপনি নিজের কাছেই প্রশ্ন করুন আপনার জন্য কোন প্লাটফর্ম? ইউটিউব নাকি ব্লগিং?

আপনি যদি নিয়মিত কোরা ব্যবহারকারী হোন এবং ফেসবুক থেকে আপনার বেশির ভাগ সময় কোরা তে কাটে তাহলে ব্লগিং আপনার জন্য। আর যদি আপনি অন্যদের মতো বিনোদন প্রিয় হোন এবং দিনের বেশির ভাগ সময় আপনার ফেসবুকেই কাটে তাহলে সাফ বলবো ভাই ব্লগিং আপনার জন্য নয়।

আমার এই কথা গুলো বলার একটাই কারন। সেটা হলো – অডিয়েন্স সবখানেই আছে। কোন প্লাটফর্মের বেশি আবার কোন প্লাটফর্মের কম। আর ব্লগিং এ সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো ধৈর্য্য। এখানে সফলতা পেতে হলে আপনাকে স্মার্ট ওয়ার্ক করতে হবে হার্ড ওয়ার্ক নয়।

কিন্তু কিছু শ্রেনীর মানুষ দুইদিন ব্লগিং এ এসেই পাঠক না পেয়ে বলবে ব্লগিং এর দিন শেষ। আমি বলবো এগুলো হলো ধৈর্য্যের অভাব বই আর কিছুই নয়।

একটা কথা প্রায়শই শুনে থাকবেন, ”আমরা ইউরোপ আমেরিকা থেকে ১০০ বছর পিছিয়ে আছি”। কথাটা কিন্তু আসলেই সত্যি। কেননা আমরা এখনো বিনোদনটাকে কাজের চেয়ে অনেক বেশি প্রাধন্য দিই।

আপনি কি জানেন? ফেসবুকের সবচেয়ে বড় গ্রাহক হলো আমাদের এশিয়া। ফেসবুকের মার্কেট শেয়ার টিকে রয়েছে আমাদের এই এশিয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য। কিন্তু এই ফেসবুক যারা বানিয়েছে তাদের দিকে লক্ষ্য করুন।

আমেরিকা বা ইউরোপের কথাই ধরা যাক, সেখানে জনপ্রিয় সব প্লাটফর্ম গুলোর শীর্ষে রয়েছে Reddit এবং Quora এর মতো প্লাটফর্ম। কারন তারা পাঠক শ্রেনী তৈরি করতে পেরেছে। যেটা আমরা পারিনি।
তবে এই অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। কেননা আমাদের দেশেও কোরা প্লাটফর্মটি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এবং অনেক বড় একটি পাঠক শ্রেনি তৈরি হচ্ছে।

সুতারাং বাংলায় ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ যে উজ্জল সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আপনার ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ আপনার নিজের হাতে:

জ্বী ঠিকই শুনেছেন। আপনার ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ আপনার নিজের হাতেই। আপনি আপনার ব্লগিং ক্যারিয়ারে সফল হবেন নাকি ব্যর্থ হবেন সেটা সম্পূর্নই নির্ভর করবে আপনার কাজ এবং আগ্রহের উপর।

আমাদের মধ্যে আবার আরো অনেক মানুষ আছে যারা ব্লগিং শুরু করার পূর্বে নানান ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। তার মধ্যে আরো একটি মজার প্রশ্ন হলো – ব্লগিং করে আপনি মাসে কত টাকা পান বা কত টাকা ইনকাম করা যায়?

দেখুন, ব্লগিং একটি ক্যারিয়ার। আপনি হঠাৎ করে এসেই এখানে সফল হতে পারবেন না। তার জন্য আপনার ধৈর্য্য এবং ব্লগিং এর উপর ভালোবাসা দুটোই থাকতে হবে।

প্রথমত বেশির ভাগ মানুষ মাঝ পথে এসে ব্লগিং ছেড়ে দেয় কারন হলো ভিজিটরের অভাবে। কষ্ট করে আর্টিকেল লিখে সাইটে যদি ভিজিটর না আসে তাহলে কারোরই ধৈর্য্য থাকার কথা না। কিন্তু সকল সফলতার পিছনে সময় অনেক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। ব্লগিং এর ক্ষেত্রেও এর বিপরীত কিছু না।

কেননা একটি ব্লগ সাইট র‌্যাংক করতে কম করে হলেও ৮ মাস থেকে ১ বছর সময় লেগে যায়। আর প্রমান আমি নিজেই পেয়েছি। আপনাদের সাথে আমার নিজের ব্লগিং এর একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি।

আমার একটি ইংরেজি সাইট আছে যেখানে নিয়মিত ৬-৭ মাস আর্টিকেল লেখার পর ও একটি আর্টিকেলও র‌্যাংক করাতে পারিনি। অর্থাৎ দিনে ১-২ টা ভিউও আসতো না। তার পর যা সবাই করে সেটাই করলাম, আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম এবং সাথে ইংরেজি সাইটটিতে আর্টিকেল লেখাও।

কিন্তু ১ বছর পর হঠাৎ করেই দেখতে পারলাম আমার মোটামুটি ৮-৯ টা আটিকেল গুগলের প্রথম পেজে শো করছে এবং সেই সাথে মোটামুটি পরিমান ট্রাফিক ও আসতে শুরু করেছে।

এর পর গুগল করা শুরু করলাম, যখন আর্টিকেল লিখতাম তখন সাইট র‌্যাংক করলো না কিন্তু সব কিছু ছেড়ে দেওয়ার পর কেন সাইট র‌্যাংক করলো?

এবং উত্তর যেটা পেলাম সেটা হলো, গুগল নতুন ডোমেইন গুলোকে খুব সহজেই র‌্যাংক দিতে চায় না। কেননা গুগল খুব সহজেই নতুন কোন সাইটকে বিশ্বাস করে না। এর জন্য একটু সময়ের প্রয়োজন। অর্থাৎ ডোমেইন এর বয়স মোটামুটি ১ বছর হলেই তা গুগলের নিকট বিশ্বাসযোগ্য হতে শুরু করে।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আপনার ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ আপনার নিজের হাতেই। আর তাই ধৈর্য্য হারা না হয়ে, একটু সময় এবং পরিশ্রম দিন তাহলে অবশ্যই আপনি ব্লগিং এ সফল হবেন।

ব্লগিং সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য এবং পরিসংখ্যান

  • প্রতি মাসে প্রায় ৪০৯ মিলিয়ন মানুষ ২০ বিলিয়নের ও বেশি ব্লগ পেজ দেখে থাকেন।
  • সারা বিশ্বে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৭৭% ব্লগ আর্টিকেল পড়ে থাকেন।
  • আমেরিকায় প্রতি ১০০ জনের ১০ জন নিজেকে ব্লগার হিসাবে দাবি করেন।
  • আমেরিকার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা তাদের ইমেইল থেকে ৩ গুন বেশি সময় ব্লগের পিছনে ব্যয় করেন।
  • ব্লগ পোষ্ট হলো সবচেয়ে বেশি অনলাইনে শেয়ার হওয়া কন্টেন্ট।
  • অনলাইনে সঠিক তথ্যের উৎস গুলোর মধ্যে ব্লগ সাইট গুলোকে ৫ম বিশ্বস্ত উৎস হিসাবে রেট দেওয়া হয়েছে।
  • ৬০% এর ও বেশি মানুষ ইকমার্স সাইট গুলো থেকে পন্য ক্রয় করে কোন না কোন ব্লগের পোষ্ট পড়ে।
  • ব্লগের সংখ্যা দিন দিন এতটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্লগার সংখ্যা বেড়ে ৩১.৭ মিলিয়ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
  • ২০১৫ সাল এর পর থেকে ব্লগিং ১২% বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • ২০১৯ সাল পর্যন্ত অনলাইনে মোট ব্লগের সংখ্যা ছিলো ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি।
  • শুধু মাত্র Tumblr এর 440 মিলিয়নেরও বেশি ব্লগ রয়েছে। যেখানে ওয়ার্ডপ্রেসের প্রায় 60 মিলিয়ন এর মতো ব্লগ রয়েছে। এবং বর্তমান জরিপ অনুসারে ওয়ার্ডপ্রেসের ব্লগের সংখ্যা অনেক বেশি পরিমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • এই মুহুর্তে, অনলাইনে প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ওয়েব পেজ রয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় তা চলতি বছর পর ২ বিলিয়ন এ পৌছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
  • শুধু মাত্র ওয়ার্ডপ্রেস ব্যবহারকারীদের থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৭০ মিলিয়ন পোস্ট প্রকাশিত হয়।

ব্লগিং পরিসংখ্যান সম্পর্কিত আরো তথ্য জানতে এখানে ক্লিক করুন।

=শেষ কথা=

বাংলায় ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ বিষয়ক আর্টিকেলে আশা করি মোটামুটি ধারনা দিতে পেরেছি। তবে শেষে একটি কথাই বলবো, আপনি যদি ব্লগিং করতে আগ্রহী হোন তাহলে অবশ্যই কোরাতে নিয়মিত অ্যাক্টিভ থাকুন। কেননা, কোরা যেমন আপনাকে ব্লগিং এ আপনার আগ্রহ ধরে রাখতে সহায়তা করবে, ঠিক তেমনি বাংলায় ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে সেই বিষয়ে যথেষ্ট ধারনা ও পেয়ে যাবেন।

পরবর্তী আর্টিকেল আসা পর্যন্ত ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। ধন্যবাদ।

Share this

2 thoughts on “বাংলায় ব্লগিং এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে?”

  1. অসাধারণ লেখা, ভাইয়া আপনার লেখার মান সত্যি ভালো ছিলো। আমি শেষ পর্যন্ত পরেছি। নতুন ব্লগিং শুরু করেছি, তবে আপনার আর্টিকেল পরে অনেক অনুপ্রানিত হলাম।

    Reply

Leave a Comment